হুইলচেয়ারের মহাবিশ্ব পর্যটক
হার না মানা এক বিজ্ঞানীর গল্প

ক্রিসমাসের ছুটিতে একুশ বছর বয়সী তরুণটি বাড়ি এল,পরিবারের সবার সাথে ছুটি কাটাবে বলে। কিন্তু ছেলেটার স্বাস্থ্যের অবস্থা খুব একটা ভাল না। অল্প চলা-ফেরা করলেই হাঁপিয়ে ওঠে। কথা অস্পষ্ট হয়ে যেতে শুরু করেছে। এমন অবস্থা দেখে পরিবারের সদস্যরা চিন্তায় পড়লেন। শেষমেশ তাকে ডাক্তারের কাছে পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হল। ২১ বছর বয়সে জীবনের সবচাইতে কঠিন সত্যটি জানতে পারলেন। ডাক্তাররা তাকে বললেন তার সম্ভাব্য আয়ু মাত্র আর দুইবছর। কিন্তু ডাক্তারদের সেই ভবিষ্যতবাণী মিথ্যা করে দিয়ে বেঁচে রইলেন আর অনেক কয়বছর। আর বেঁচে থেকে মহাবিশ্ব নিয়ে বিজ্ঞানের সীমানাকে আরও বিস্তৃত করে পৃথিবীর ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে গেলেন।
বলছি পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংএর কথা। আধুনিক কালের ইতিহাসে স্টিফেন হকিং এর নাম শোনেনি এমন কোন শিক্ষিত লোক বোধহয় পাওয়া যাবে না। হকিং এর জন্ম ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে ৮ই জানুয়ারি ১৯৪২ সালে, গ্যালিলিওর মৃত্যুর ঠিক তিনশত বছর পরে। তার বাবা-মায়ের বাড়ি ছিল উত্তর লন্ডনে, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাচ্চা প্রতিপালনের জন্য লন্ডনের চাইতে অক্সফোর্ড অনেক বেশি নিরাপদ ছিল। সন্তানের ভবিষ্যৎ ভেবে সে কারণেই লন্ডন ছেড়ে তারা পাড়ি জমান অক্সফোর্ডে। পরে ফিরে আসেন লন্ডনে।

শৈশব ও কৈশোর
হকিং তার স্কুল যাওয়া শুরু করেন লন্ডনের হাইগেটের বায়রন হাউজ স্কুল দিয়ে। তিনি পরবর্তী কালে তার পঠন সমস্যার জন্য এই স্কুলের শিখন পদ্ধতিকে দোষারোপ করেন। আট বছর বয়সে তাঁরা আবার চলে যান সেন্ট অ্যালবানস নামের ছোট্ট শহরে , উত্তর লন্ডন থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে। ওখানেই সেন্ট অ্যালবানস স্কুলে যান, এরপর অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি কলেজ ভর্তি হন; যেখানে তাঁর বাবাও পড়াশোনা করেছিলেন। হকিং এর বাবা চেয়েছিলেন তার ছেলে প্রখ্যাত ওয়েস্টমিনিস্টার স্কুলে পড়ুক,কিন্তু শিক্ষাবৃত্তি পরীক্ষার দিন হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন হকিং। সেইসময় ফিস দেবার মত আর্থিক অবস্থা ছিল না তার পরিবারের, ফলে ওয়েস্টমিনিস্টারে পড়া আর হয় না । সেন্ট আলবানসের স্কুলেই থেকে যেতেই হয়। সেন্ট আলবানস স্কুলে থাকার ফলে তার খুব কাছের কিছু বন্ধু তৈরি হয়ে যায়। তাদের সাথে মিলে নানাধরনের আতশবাজি , বিমান ও নৌকার মডেল বানাতেন। বন্ধুদের সাথে খ্রিস্টান ধর্ম এবং ইন্দ্রিয় বহির্ভূত নানা ধারণা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করতেন ।
প্রেম এবং বিয়ে
এরমধ্যে পরিচয় হল বোনের বান্ধবী জেন ওয়াইল্ডের সাথে। ১৯৬৩ তে পরিচয় আর ১৯৬৫তে বিয়ে করেন। হকিং এর জীবনে জেন ওয়াইল্ড এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন। পৃথিবীতে সবচাইতে দূর্বোধ্য কি, এই প্রশ্নের জবাবে দীর্ঘ সময় ধরে সংসার করা রসিক হকিং বলেছিলেন নারী ! পদার্থবিদ্যার জটিল সব তত্ত্ব যারকাছে ছেলেখেলা, যার সময় কেটেছে মহাবিশ্বকে বোঝার মধ্যে দিয়ে তিনি হার মেনেছেন নারীকে বুঝতে গিয়ে।
লেখালেখি
যে বইটি সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় অনেক দিন উপরের সারিতে ছিল সেই ‘কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ নামের বইটি লিখেছিলেন মেয়ের পিএইচডি গবেষণার ব্যয় যোগানোর জন্য। প্রকাশক তাকে আগেই বলে দিয়েছিলেন যে বইটি সাধারণ মানুষের উপযোগী হতে হবে। মহাবিশ্বের অতীত এবং বর্তমান সময়কে সাধারণের বোধগম্য করে তোলার দায়িত্ব নেন নিজের কাঁধে। একজন তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী হয়েও খুব সহজ সরল করে বইটি লেখেন তিনি। যতদিনে বইটি লেখা শেষ হয়ে প্রকাশিত হল ,ততদিনে তার মেয়ের পিএইচডি সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। প্রকাশের পরে সাড়া পড়ে গেল, পাঠকেরা লুফে নিল বইটি। ২৩৭ সপ্তাহ ধরে বইটি সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় ছিল। পৃথিবীর অধিকাংশ ভাষাতেই অনূদিত হয়েছে বইটি। এরপরে আরও বেশকয়েকটি বই প্রকাশ পেয়েছে। মেয়ে লুসির সাথে মিলে বাচ্চাদের জন্যও বই লিখেছেন বেশ কয়েকটি।
বিজ্ঞানে অবদান
রজার পেনরোজের সাথে মিলে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গ্র্যাভিটেশনাল সিংগুলারিটির তত্ত্ব প্রমাণ করেন। এটি হকিং-পেনরোজ তত্ত্বও নামেও পরিচিত। এছাড়া কৃষ্ণ গহবর নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগের ধারনা পাল্টিয়ে দিয়ে কৃষ্ণ গহবর থেকে বিকিরণ নির্গত হয় বলে তাত্ত্বিক অভিমত প্রদান করেন। যা হকিং বিকিরণ নামে পরিচিত। সারা বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানী হিসাবে একনামে পরিচিত হলেও তিনি কখনো নোবেল পুরষ্কারের জন্য মনোনীত হননি। কারণ বিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে আবিষ্কারটি অবশ্যই পর্যবেক্ষণ দ্বারা নিশ্চিত হতে হবে। যা হকিং বিকিরণের ক্ষেত্রে এই মুহুর্তে সম্ভব নয়। সঙ্গী জিম হার্টলের সাথে মিলে হকিং এর অন্যতম বড় আবিষ্কার হচ্ছে সীমানাহীন মহাবিশ্ব তত্ত্ব। যেটি তিনি প্রকাশ করেন ১৯৮৩ সালে।
গণমাধ্যমে হকিং
মৃত্যু
হকিং এর মৃত্যু সারাবিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানপ্রেমী মানুষকে তো বটেই, সাধারণ মানুষকেও আন্দোলিত করেছে। আইনস্টাইনের জন্মের ঠিক একশ বছর পরে হকিং এর মৃত্যু হয় অর্থ্যাৎ ২০১৮ সালের ১৪ই মার্চ। হুইলচেয়ারে সারাটাজীবন বন্দি থেকেও এই মহাবিশ্বের আনাচে-কানাচে সম্পর্কে জ্ঞান তার চাইতে খুব বেশি জনের হয়নি। ভয়েস সিন্থেসাইজারের মাধ্যমে কথা বলা আর মুখাবয়বের সামান্য নাড়াচাড়া দিয়ে কম্পিউটারে টাইপ করে বিজ্ঞানের জগতকে সমৃদ্ধ করা এ মানুষটিকে ভুলবে না পৃথিবী।